কর্মচ্যুত সাংবাদিকদের নাকের ডগায় লুচি ভিক্ষান্নে মমতার মানবিক দশ হাজারি অনুদানে প্রশস্ত আরো কর্মচ্যুতির রাজপথ

 

 

মদনমোহন সামন্ত,14 সেপ্টেম্বর, কলকাতা :
ঘুটঘুটে মিশকালো নিকষ গাঢ় অন্ধকার ভবিষ্যতে চপলাক্ষণিকার সোনালি আলোকরেখা চকিতচমকে পটলচেরা নয়নকমলদল যুগলকে ধাঁধিয়ে দিল যে! এখন থেকে কাগজ-কালিপূর্ণ কলম-দস্তাবেজ কাঁধের শান্তিনিকেতনী ঝোলা ব্যাগে অথবা অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলের মেমরিতে স্টোর করে শয়নে-স্বপনে-জাগরণে সবসময় সঙ্গে রাখা অবশ্যই দরকার। কে বলতে পারে কখন দরকার হয়!
মুখলুকানো অন্ধকার ঘরে বিছানায় শুয়ে ঘুম কামাই করে কল্পনায় রাতের তারা গোণা নয়, নয় বেছে বেছে মাথার অর্ধ্বপক্ব বিরল কেশরাজি ছিঁড়ে ছিঁড়ে ইন্দ্রলুপ্ত করা! ‘সুন, সুন, সুন, আরে বাবা সুন, ইস চ্যাম্পিমে বড়ে বড়ে গুণ…’, এসে গিয়েছে কেশকালা করে হৃদয়ানন্দে উদ্বাহু নৃত্যের সময়! ভ্রষ্টচন্দ্রের মত মনোকষ্টগুলিকে নষ্ট করে কচি বয়সে কাজে যোগ দেওয়ার প্রথম দিন স্মরণ করে অথবা টাইম মেশিনে পিছিয়ে গিয়ে প্রথম ‘স্যালরি’ পাওয়ার দিন ভেবে নিয়ে গিঁট গিঁটে বাতের ‘বেতা’ নিয়েও চরকি বা লাট্টুর মত চার দু’গুণে বিয়াল্লিশ বার পাক মারার সময় এল বুঝি। কারণ, কর্মচ্যুত সাংবাদিকদের দুশ্চিন্তার অবসান হতে চলেছে এবার। সৌজন্যে অধুনাকালের ‘মানবিক সরকার’। তেমনটাই কিশোরায়িত প্রশান্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষ্য বলে সংবাদে প্রকাশ। নেতাজী নামাঙ্কিত ইন্ডোর স্টেডিয়ামে নেতা যিনি হবেন, তিনি তো এভাবেই প্রকাশিত হবেন।
এককালে যখনতখন হুটহাট করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে লোডশেডিং হওয়ার মত সাম্প্রতিক কালে স্যাটাস্যাট কাজশেডিং হয়ে যাচ্ছে সাংবাদিকদের। বলা ভাল, মিডিয়া পার্সনদের। মানে সাংবাদিক, চিত্রসাংবাদিক, ভিডিও ক্যামেরাপার্সন, মায় পোড়খাওয়া পোড়ারমুখোমুখী সিনিয়র জার্নালিস্ট-কলামনিস্ট সব্বার। ঘাসের ফুল-গোড়া-শিকড় চিবানোকালে কেউ রেহাই পাচ্ছে না! সংবাদজগতের অসাংবাদিক কর্মীরাও না। কারও কিচ্ছু করার নেই। মালিক, ইউনিয়ন, প্রেস ক্লাব, জোটবদ্ধ মিডিয়া পার্সন, আইন আদালত — কারওরই কিছু করার নেই। কোথাও যাওয়ার নেই। সর্বত্র ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট এ তরী’। অতএব ‘শুষ্কং কাষ্ঠং’ মুখে এর ‘হাতে ধরা’, তার ‘পায়ে পড়া’ ছাড়া ‘নো ওয়ে’ । মর্য্যাদার গুষ্টির তুষ্টি করে এলেবেলে কাউকে ধরেধারে উপযুক্ত নৈবেদ্য চড়িয়ে পারলে সুড়ুৎ করে ‘ব্যাকডোর’ দিয়ে ‘থ্রু প্রপার ব্যাকিং চ্যানেল’ ম্যানেজ করে ‘পজিশন’ নেওয়া। লজ্জার নো কারণ। আপনি বাঁচলে বাপের নাম। দরকার শুধু ইনকাম। ‘এভ্রিথিংগ ইজ ফেয়ার ইন ওঅর অ্যান্ড লভ’। তা পেশাটাকে ভালবাসা বলেই তো এত যুদ্ধু করা। এখানেও একই রুল বলবৎ অবশ্যই। তা, এবার খুশির কারণ ‘জরা হটকে”। ইউনিক আইডেন্টিফিকেশনের মত ‘ইউনিক আইডিয়া’। আইডিয়ালিজমে ‘মারো গোলি’। এমন আইডিয়াল আইডিয়া বিশ্বের কোথাও দেখাতে পারবে না। এটার প্রোটোটাইপ এবং কপিরাইট একমাত্র ভুভারতের এই বাংলার। ‘বাংলা আজ যা ভাবে ভারত ভাবে কাল’ নয়, বাংলা, থুড়ি, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী গতকাল যা ভেবেছেন বিশ্ব তা ভাবেনি কোনওকাল!
যেসব সাংবাদিকের কাজ গিয়েছে তারা অন্তত আগামী দু’বছর নিশ্চিন্ত মনে আর কিছু না হলেও ভাত-ডাল-আলুসেদ্ধ খেতে পাবেন বিনা পরিশ্রমে – অনুদানে। মানে ২১এর নির্বাচন পর্যন্ত নিশ্চিন্তি। ভোট বড় বালাই। তা হোক। নাকের ডগায় লুচি- ওইটুকুনির জন্য হাপিত্যেশ করে চাতকের মত করুণ চাউনিতে বসে আছে পথ চেয়ে কত্ত জনা। ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হবে না সেটা নয় তাঁর অজানা।
যারা শুধু ভাত-ডাল-আলুসেদ্ধ খেতে অভ্যস্ত নয় বা আরও আয়েস করে সঙ্গে মাছ-মাংস খেতে চাইবেন তারা শর্তসাপেক্ষে, মানে টি অ্যান্ড সি, তা-ও পাবেন। শর্ত হল, স্বামী-স্ত্রীর কোনও একজনকে দেহান্তর নিয়ে টা-টা-বাই-বাই করে ড্যাং ড্যাং করে পরপারে চলে যেতে হবে। ব্যস, এই পারে আমি আর ওই পারে তুমি, মাঝখানে মাংসের ঝোল বয়ে যায়। ভুলেও মনে আনবে না, ‘তুমি কোথায়? ‘ এ মায়া প্রপঞ্চময়! দু’লাখ পেতে গেলে এইটুকু ‘স্যাক্রিফাইস’ তো করতেই হবে, উইথ প্রুফ। তুমি যে বলতে — তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই , আই লভ য়ু মাই ডার্লিং! এবার সময় আসছে প্রমাণ দেওয়ার। ভালবাসা মাপার কি টেকনিক, য়ার! পেটেন্টের অ্যাপ্লিকেশন ফরোম চুটকিতে ফিলাপ করে রাখা দরকার।
ইন ডিটেইলস, “কর্মচ্যুত সাংবাদিকদের সরকার মাসে দশ হাজার টাকা অনুদান দেবে”, গতকাল শুক্রবার নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে সরকারি কর্মচারীদের এক অনুষ্ঠানে ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর। “সাংবাদিকরা কর্মচ্যুত হলে রাজ্য সরকার তাদের মাসে মাসে দশ হাজার টাকা অনুদান দেবে৷ এই অনুদান দেওয়া হবে টানা দু’টি বছর৷ এছাড়া, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের স্বামী-স্ত্রী কেউ মারা গেলে এককালীন দু’ লাখ টাকা দেবে সরকার ৷” শুক্রবার এই ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “সাংবাদিকরাও আজ নিরাপদ নন৷ তাঁদের চাকরি চলে যাচ্ছে৷ আমাদের সরকার মানবিক৷ তাই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি৷” তিনি জানিয়েছেন, “অর্থমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রী এবং আইনমন্ত্রীকে নিয়ে একটি কমিটি তৈরি করে দেওয়া হয়েছে৷ সেই কমিটিই বিষয়টি কার্যকর করবে৷”
জানিয়েছেন, “মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সাংবাদিকদের এই আর্থিক সুরক্ষা দেবে সরকার৷”
ফাইন প্রিন্টস বিটুইন দ্য লাইন্সে আতস কাঁচ ধরলে গতকালের পুঁচকে পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটি দেখা বাটি পেতে অনুদান গ্রহণেচ্ছুক দুর্মুখেরা অবশ্য আবিষ্কার করছে চন্দ্রমার দক্ষিণাপথ আঁকাবাঁকা শুধু নয়, বন্ধুরও বটে। কবে থেকে পাওয়া যাবে ভিক্ষার অনুদান? কারা অনুদানের উপযুক্ত হবে? কর্মচ্যুত যে কোনও সাংবাদিক? নাকি শুধু ব্যঙ্গার্থে ‘বিপিএল’ কার্ডধারী অর্থাৎ অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডধারী? শুধু সাংবাদিকরা নাকি প্রসারিত অর্থে সামগ্রিককভাবে সব ধরণের মিডিয়াপার্সনরা? ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকরা কি অনুদানের আওতায় আসবেন? চিত্রসাংবাদিকরা? যে কোনও হাউসের যে কেউ, নাকি বিশেষ বন্ধনীতে অবস্থানকারী বিশিষ্টজনেরা মাত্র? কিসের বিনিময়ে এই অনুদান? ওনারা জয়ঢাক পেটাবেন কোথায়? ভিত্তিসময় ধার্য্য হবে কবে থেকে? অদূর ভবিষ্যতে যেসব মিডিয়া হাউস বন্ধ হতে চলেছে তারা কি এই সুযোগ পাবে? এই পদক্ষেপের ফলে আরও মিডিয়া হাউস বন্ধ করতে উৎসাহ জোগানো হল না কি? মোট কতজনকে অনুদান দেওয়া হবে? সব তথ্য হাতে আছে কি? কর্মচ্যুতদের অনুদান ভিক্ষার টোপ না দিয়ে তাদেরকে মর্য্যাদা সহকারে ওই পরিমাণ অর্থে কর্মসংস্থান দিয়ে সরকারী “বসুমতী” সংবাদপত্রের পুনরুজ্জীবন সাধন করানো যেত না কি? যেখানে সরকারী সহযোগিতার অভাবে এমনকি দলীয় চাপে একের পর এক মিডিয়া হাউস ঝাঁপ বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে বা কর্মীসংকোচনের দিকে পা বাড়াচ্ছে সেখানে গরু মেরে জুতো দানের পরিহাসপূর্ণ এমন চাবুক কি না মারলে চলছিল না?এখনও সাংবাদিক পেনশন উপযুক্ত প্রাপকরা অনেকেই নিয়মিত পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ শোনা যায়। টাকা না থাকার ভাঙা রেকর্ড চালানো এই সরকারের হাতে বাড়তি টাকার জোগান কোথা থেকে আসবে? এমনিতেই ডিএ বকেয়া রয়েছে। সেসব মেটানো যায় নি। বহুক্ষেত্রেই নির্ধারিত মাইনের থেকে কম মাইনে পাওয়ার জন্য পুঞ্জীভূত হচ্ছে ক্ষোভ। হ্যাঁ, মুখ্যমন্ত্রীর নিজের পুলিশ মহলেও। বহুক্ষেত্রেই বকেয়া রয়েছে মাইনে। তার উপর ষষ্ঠ কমিশনের বোঝা! নুন আনতে পান্তা ফুরানো সরকারের রুগ্ন রক্তহীন শীর্ণ কোষাগারে প্রাণশক্তি জোগানোর পথ খুঁজে পাওয়া দুরাশা। এমতাবস্থায় আর্থিক প্রতিশ্রুতির অনর্গল বন্যাস্রোত আখেরে কি ‘হারাকিরি’র পথে এগিয়ে যাওয়া নয়! কারণ মুখ্যমন্ত্রীর আপন মুখনিঃসৃত বাণী অনুসারে “আমি অর্থনীতি ভাল বুঝি না”। বল্মীকঢিবির উপর প্রাসাদোপম অট্টালিকা গড়ার রঙিন ফানুস ওড়ানো নিষ্ফল প্রয়াস ছেড়ে বাস্তবের কঠিন রুক্ষ্ম মাটি চষে ধীরে অথচ সযতনে পরিচর্যা করা গাছে ফল ধরে বেশি, তা বিস্মৃত হলে চলবে কেন