আজ বোধন, আজ অশুভ শক্তি বিনাশের ডাকের দিন

 

অনির্বাণ সেন,4অক্টোবর, সাঁইথিয়াঃ বোধন শব্দের বাঙ্গলা অর্থ উদ্বোধন, নিদ্রাভঙ্গকরণ, বা জাগান। আর অকাল শব্দের মানে ‘অসময়, শুভকর্মের অযোগ্য কাল। সংস্কৃত ‘অকাল’ ও ‘বোধন’ শব্দদুটি বাংলা ভাষায় তৎসম শব্দ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। তাই অকালবোধন শব্দবন্ধটির অর্থ অসময়ে বোধন বা জাগরণ। অসময়ে দেবী দুর্গার আরাধনা এই প্রসঙ্গে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস বলেছেন মাঘ হ’তে আষাঢ় এই ছয় মাস উত্তরায়ণ। শ্রাবণ হ’তে পৌষ এই ছয় মাস দক্ষিণায়ণ। এ সময়টা ছিল স্বর্গের দেবীদের নিদ্রাগমনের সময়, অর্থাৎ যখন বৃষ্টি হবার আর সম্ভাবনা থাকে না। উত্তরায়ণ দেবতাদের দিন এবং দক্ষিণায়ণ দেবতাদের রাত্রি। রাত্রিকালে দেবী নিদ্রিত থাকেন বলে তাঁহার বোধন করে পুজো শুরু করতে হয়। ষষ্ঠীতেই বোধন হয়।
হিন্দু পুরাণে উল্লেখ আছে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য দুর্গাপূজা করেছিলেন বসন্তকালেই। দুর্গাপূজার বিধিসম্মত সময়কাল হল হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে চৈত্র মাস। বসন্তকাল। তাই সে পুজো বাসন্তীপূজা নামে পরিচিত। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ গ্রন্থের প্রকৃতি খন্ডে (১/১৪৭) লেখা অনুযায়ী-
“পূজিতা সুরথেনাদৌ দেবী দুর্গতিনাশিনী।
মধুমাসসিতাষ্টম্যাং নবম্যাং বিধিপূর্বকম্‌।।”
রাজা সুরথ চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী ও নবমী তিথিতে শাস্ত্রবিধিমতে দেবী দুর্গতিনাশিনীর (দুর্গা) পূজা করেছিলেন। বসন্তকাল উত্তরায়ণের অন্তর্গত। উত্তরায়ণে দেবতারা জাগ্রত থাকেন বলে বাসন্তীপূজায় বোধনের প্রয়োজন হয় না।

মহাশক্তির মহাপূজার সূচনা হয় বোধনের মধ্যে দিয়ে৷ দেবীপক্ষের শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে দেবীকে উদবোধিত করা হয়৷ কৃত্তিবাসী রামায়ণ-এর দুর্গাপূজার বিবরণের চাইতে পৌরাণিক দুর্গাপূজার বিবরণ কিছুটা আলাদা। কালিকাপুরাণ অনুসারে, রাবণবধে রামচন্দ্রকে সাহায্য করার জন্য রাত্রিকালে দেবীর বোধন করেছিলেন ব্রহ্মা। জাগরনের এই প্রক্রিয়াটিই হল ‘বোধন’। হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে, শরৎকাল দেবলোকের রাত্রি দক্ষিণায়নের অন্তর্গত। তাই এই সময় দেবপূজা করতে হলে, আগে দেবতার বোধন (জাগরণ) করতে হয়। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে, আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথি অথবা শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে হিন্দু দেবী দুর্গার পূজারম্ভের প্রাক্কালে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। শরৎকাল দেবপূজার ‘শুদ্ধ সময়’ নয় বলে রাম কর্তৃক দেবী দুর্গার বোধন ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত হয়। উল্লেখ্য, শাস্ত্রমতে বসন্তকাল দুর্গাপূজার প্রশস্ত সময় হলেও, আধুনিক যুগে শারদীয়া দুর্গাপূজাই অধিকতর প্রচলিত। অকালবোধন হল শারদীয়া দুর্গাপূজার প্রারম্ভিক অনুষ্ঠান। আবার একাধিক পুরাণ ও অন্যান্য হিন্দু ধর্মগ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে যে, রাবণ বধের পূর্বে রাম দেবী দুর্গার কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে বিল্ববৃক্ষতলে বোধনপূর্বক দুর্গাপূজা করেছিলেন। দেবীর বোধনের আলোচনা পাওয়া যায় মৎস্যপুরাণ, মার্কেণ্ডয়পুরাণ, শ্রীশ্রীচণ্ডী, দেবীপুরাণ, কালিকাপুরাণ এবং দেবী ভাগবতে।
কেউ কেউ বলেন সীতা হরণ হওয়ায় পৃথিবীর মাটি শুকিয়ে গিয়ে খরার সৃষ্টি হয়। কারণ সীতা ছিলেন ধরণীর কন্যা। তার পিতা তাকে জমি কর্ষণ করার সময় পৃথিবীর বুক থেকেই পেয়েছিলেন। জল ছাড়া যেহেতু চাষবাস অসম্পূর্ণ তাই রাম যজ্ঞদ্বারা খরা সৃষ্টিকারী রাবণকে বধ করে অকালবর্ষণ করেছিলেন। এ অকালবর্ষণকেও অকালবোধন বলা হয়।
আজ দুর্গাপূজার মহাষষ্ঠী। অন্য সময় গাইলেও বিশেশত এই দিনে কালীঘরে গিয়ে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আপনমনে গাইতেন–
“উপায় না দেখি আর, অকিঞ্চন ভেবে সার, তরঙ্গে দিয়ে সাঁতার, দুর্গা নামের ভেলা ধরি”।
আসলে যে কোনো শুভ কাজের আগেই দুর্গা নামের ভেলা ধরতে হবে। আদতে দুর্গা তো নারী শক্তির প্রতীক মাত্র। আবার রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সন্ন্যাসী মহারাজ স্বামী অবিচলানন্দ জানান, রাবণকে নাশ করার লক্ষ্যে শ্রীরামচন্দ্রকে অনুগ্রহ করার জন্য অকালে দেবীকে জাগরিত করা হয়েছিল। দুর্গাপূজায়- ‘ব্রাহ্মমুহূর্তে, সম্পন্ন অধিবাসে বোধন হয় মা দুর্গার, শঙ্খে শঙ্খে সমাদরে। যেহেতু শরতে দেবতারা নিদ্রিত থাকেন, তাই তাদের জাগিয়ে পূজাপার্বণ করা শাস্ত্রীয় নিয়ম।

শ্রীশ্রীচণ্ডীর একাদশ অধ্যায়ের অংশে মহাঋষিগণ দেবীর স্তব করেছেন। তাঁরা স্তবের মাধ্যমে দেবী স্মরণ করে বলেছেন-
স্মরণ করেছেন, “সিংহস্থা শশীশেখরা মরকতপ্রেক্ষাঃ চতুর্ভিভুজৈঃ, শঙ্খং চক্র ধনু শরাংশ্চ দধতিনেত্রৈঃ স্থিভিঃশোভিতা, আমুক্তাঙ্গদ হারকঙ্কন রণংকাঞ্চী কন্বংনূপুরা –দুর্গা, দুর্গতিনাশিনী, ভবতুয়ো রত্নোলস্যৎকুন্তলা।”
“ত্বং বৈষ্ণবীশক্তিরণন্তবীর্যা/বিশ্বাস্য বীজং পরমাসি মায়া/সম্মোহিতং দেবি সমস্তশেতৎ/ত্বং বৈ প্রসন্না ভুবি মুক্তি-সিদ্ধিহেতুঃ।।”
মা সিংহবাহিনী, তোমার শক্তি, তোমার বীর্য অনন্ত অপার। তুমিই ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের জগৎপালিনি শক্তি। এই ব্রহ্মাণ্ডের তুমি আদির আদি কারণ মহামায়া। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডজগৎকে মোহগ্রস্ত করে রেখেছ, কিন্তু তুমি প্রসন্না হলে শরণাগত মুক্তিসিদ্ধি লাভ করে।

এই হল বোধনের আদি মন্ত্র। নারী শক্তির কাছে পুরুষের আত্মসমর্পণ।

_______________________
ঋণ স্বীকার-
১. ইন্টারনেট
২. উইকিপিডিয়া