মাতৃত্বের একাকিত্ব উঠে এসেছে সাঁইথিয়ার অরুণোদয়ের পুজো প্রাঙ্গনে

 

অনির্বাণ সেন,4 অক্টোবর,সাঁইথিয়াঃ তোর বাবা মারা যাওয়ার পর বহুকষ্টে তোকে বড়ো করেছি। আজ খুব একাকী লাগে রে। -ইতি তোর মা।

 

রাতে যখন তুই ভয়ে কেঁদে উঠতিস, তখন তোকে বুকের মধ্যেনিয়ে ঘুম পারাতাম। খোকা, তোর কি আজও অন্ধকারে ভয় লাগে? -ইতি তোর মা।

আমার বাতের ব্যাথাটা বেড়েছে রে। তোরা কবে আসবি? -ইতি তোর মা।

মন্ডপের প্রবেশ পথের দুদিকেই এমন সব চিঠি ঝুলছে। একাকী মায়ের ছেলেকে লেখা পোস্টকার্ড। যে ঠিকানায় চিঠি যাবে সেই শহরের নাম মায়ের মন। জেলা সন্তানের হৃদয়। আর মাঝখানে খাঁচাবন্দী কয়েকটা মা দাঁড়িয়ে আছে তাদের সন্তানের প্রতীক্ষায়।

যখন সাঁইথিয়া থেকে থেকে প্রায় ১৮০ কিমি দূরে চন্দন নগর কমিশনারেট থেকে স্থানীয় কোনো বৃদ্ধাশ্রমের মায়েদের হাতে নতূন কাপড় তুলে দেওয়া হচ্ছে, ঠিক তখুনি একাকী মায়ের করুণ মনের কথা ফুটে উঠছে সাঁইথিয়া অরুণোদয় ক্লাবের পুজো প্রাঙ্গণে। এই সময়ে যখন কোনো আদালত কারো সন্তানকে তীব্র ভর্ৎসনা করছেন বৃদ্ধা মাকে না দেখার জন্য তখন অরুণোদয়ের মন্ডপের ভেতর ফুটে উঠেছে দশমাস দশদিন সন্তানকে কীভাবে মা তার পেটের মধ্যে লালান পালন করে – আর অপেক্ষা করে থাকে কখন সেই মায়ের সন্তান ভূমিষ্ট হবে পৃথিবীতে। মা দেখবে সন্তানের মুখ।

প্রায় ১১ লক্ষ টাকা খরচ করে তৈরী হয়েছে এই পুজোর থিম। বিষয় ইতি তোমার মা। ক্লাবের সভাপতি পিনাকী লাল দত্ত জানালেন “এই থিমে মেয়েদের জীবনের তিনিটি পর্যায়ই দেখানো হয়েছে। কন্যা, জায়া, জননী। প্রতীমাটি সমুদ্রের মধ্যে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে মাতৃচক্র। আর আমরা দেখিয়েছি মায়ের একাকিত্ব কষ্ট। কখনো বৌএর চাপে, কখনো কাজের চাপে আবার কখনো কাজের শর্তে দূরবর্তী স্থানে থাকার জন্য মাকে দেখতে পারে না ছেলে সব সময়। আর এদিকে বৃদ্ধা মায়ের একাকিত্ব বেড়েই চলে। বেড়ে চলে অসহনীয়তা। জগৎ-এর সব সন্তানের একটু শুভবুদ্ধি, মায়ের প্রতি আর একটু দায়িত্ববোধ বাড়ানোর জন্যই আমাদের এই উদ্যোগ”।

প্রায় বছর ২৫ আগে নচীকেতা গেয়েছিলেন-
“ছেলে আমার মস্ত মানুষ,মস্ত অফিসার
মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার ।
নানান রকম জিনিস, আর আসবাব দামী দামী
সবচেয়ে কম দামী ছিলাম একমাত্র আমি।
ছেলের আমার,আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম
আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম!”

সত্যিই এযুগে বৃদ্ধাশ্রম এক মহামারীর আকার ধারণ করেছে। বৈদিক যুগের বানপ্রস্থ হয়তো উঠে গিয়ে এখন তা বৃদ্ধাশ্রমে রূপান্তরিত হচ্ছে আস্তে আস্তে। মায়েরাও এবার হয়তো বলবে-
“খোকারও হয়েছে ছেলে, দু’বছর হলো
তার তো মাত্র বয়স পঁচিশ, ঠাকুর মুখ তোলো।
একশো বছর বাঁচতে চাই এখন আমার সাধ
পঁচিশ বছর পরে খোকার হবে ঊনষাট।
আশ্রমের এই ঘরটা ছোট, জায়গা অনেক বেশি
খোকা-আমি দু’জনেতে থাকবো পাশাপাশি।
সেই দিনটার স্বপ্ন দেখি ভীষণ রকম
মুখোমুখি আমি, খোকা আর বৃদ্ধাশ্রম!”