প্লাটিনাম জয়ন্তী বর্ষের নতুন আলোতে উপমহাদেশের সর্বপ্রাচীন কলকাতা প্রেস ক্লাবে সগৌরবে রচিত হোক নতুন ইতিহাস

platinum year of Kolkata press cub

 

মদনমোহন সামন্ত,4সেপ্টেম্বর,কলকাতা : আগামী রবিবার 7 সেপ্টেম্বর ভারতের ইসরোর চন্দ্রযান-2 প্রকল্পে ল্যান্ডার বিক্রমের গর্ভগৃহ থেকে রোভার প্রজ্ঞান বেরিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করে চন্দ্রপৃষ্ঠে পরিভ্রমণ শুরু করবে। সেই দিনই প্লাটিনাম জয়ন্তী জন্মদিন পার করা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সর্বপ্রাচীন প্রেস ক্লাব “কলকাতা প্রেস ক্লাব”এ আগামী কর্মসমিতির নির্বাচন। চন্দ্রপৃষ্ঠে প্রজ্ঞান ইতিহাস সৃষ্টি করলেও কলকাতা প্রেস ক্লাবে নতুন করে ইতিহাস লেখা হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। প্রেস ক্লাবের ইতিহাস নতুন করে লিখতে হলে চিত্রসাংবাদিকদেরও ভোট দানের অধিকার সহ সদস্যপদ মঞ্জুর করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। প্লাটিনাম জয়ন্তী জন্মদিনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চিত্রসাংবাদিকদের অনুরোধে চিত্রসাংবাদিকদেরকেও কলকাতা প্রেস ক্লাবের সদস্য পদ মঞ্জুর করা উচিত বলে মন্তব্য করেন। মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য নিয়ে প্রেস ক্লাবে মতৈক্য না হলেও প্রেস ক্লাবের প্রাক্তন আধিকারিকদের কথায় জানা যাচ্ছে যে বর্তমান অবস্থায় প্রেসক্লাবে চিত্রসাংবাদিকদেরকে কোনওমতেই “ভোটিং মেম্বার” করা সম্ভব নয়। কারণ হিসাবে তাঁরা তুলে ধরছেন প্রেস ক্লাবের সংবিধানের তিন নম্বর ধারাটিকে। তিন নম্বর ধারায় বলা আছে, কলকাতা প্রেস ক্লাবের সদস্যপদ পাবেন শুধুমাত্র রিপোর্টাররা। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এতে করে কি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেস ক্লাবের সংজ্ঞা অমান্য করা হচ্ছে না? দ্বিতীয়তঃ চিত্রসাংবাদিকদের যদি সদস্যপদ দেওয়ার সম্ভাবনা সংবিধানে না-ই থাকে তাহলে “অ্যাসোসিয়েট মেম্বার” নামে “দুধেল গাই” পোষা কেন? তা-কি সংবিধান পরিপন্থী হচ্ছে না? তবে নানা জনের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে এটাও জানা যাচ্ছে যে, চাইলেই চিত্রসাংবাদিকদের সদস্যপদ দেওয়া যাবে। এবং তা-ও ভোটদানের অধিকারসহ! কিভাবে সেটা সম্ভব? তা নিয়ে প্রশ্ন করলে উত্তর পাওয়া যায়, সংবিধান সংশোধন করে। সংবিধান সংশোধন করা কি সম্ভব? এই প্রশ্ন করলে উত্তর আসছে — অসম্ভব নয়। কারণ, এর আগেও নানা কারণে সংবিধান মেনেই সংবিধান সংশোধিত হয়েছে। তবে সময়সাপেক্ষ সংবিধান সংশোধন করার নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। সেই পদ্ধতি মানতে গেলে অল্প সময়ে তা করা সম্ভব নয়। তার জন্য প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব কার্যকরী সমিতিতে পাশ করাতে হবে। এরপর কার্যকরী সমিতির সুপারিশে বিশেষ সাধারণ সভা ডাকতে হবে। সদস্যরা কোন সংশোধনী আনলে, সংশোধনী যদি কার্যকরী সমিতি প্রত্যাখ্যান করে তাহলে তা নিয়ে আলোচনা করার জন্য আবার পৃথক একটি দিন ধার্য করতে হবে। বিশেষ সভাটিতে ক্লাবের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য সংশোধনীর পক্ষে মত দিলে তবেই সংবিধান সংশোধন করা যাবে। অর্থাৎ সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাড়াহুড়ো করে ইচ্ছামত যে কোনও সময়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। প্রসঙ্গত, ভোটদানের অধিকারসহ চিত্রসাংবাদিকদের কলকাতা প্রেস ক্লাবের সদস্যপদে অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত আরও একটি বিষয় উঠে আসছে প্রবীনদের বক্তব্য থেকে। সংবাদপত্রের অধিকাংশ আলোকচিত্রীরাই প্রাথমিকভাবে ফ্রিল‍্যান্সার, তাঁরা সংখ্যায় অধিক। যাঁরা স্টাফ ফটোগ্রাফার, তাঁরা সংখ‍্যায় কম। তাই , চিত্রসাংবাদিকরা কলকাতা প্রেস ক্লাবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার পরিবর্তে নিজেরাই আলাদাভাবে ফটো জার্নালিস্ট ক্লাব খোলার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁদের ভয় ছিল, রিপোর্টারদের সংখ‍্যাগরিষ্ঠতার কারণে তাঁরা কমিটিতে অর্থাৎ ক্ষমতার কেন্দ্রে স্থান পাবেন না। সেই কারণে তৎকালীন প্রেস ক্লাবের উদ‍্যোক্তারা সংবিধানে শুধুমাত্র রিপোর্টারদের অন্তর্ভুক্তির নিয়ম করেন। পাল্টা ফটোগ্রাফাররা একটি প্রেস ফটোগ্রাফার অ্যাসোসিয়েশনও তৈরি করেন। যথেষ্ট সক্রিয় না থাকাতে যা আজও আছে বলে অনেকেই জানেন না। শুধু তাই নয়, কলকাতায় কর্মরত মহিলা চিত্রসাংবাদিকদেরও ভিন্ন একটি সংগঠনের অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়। নিজেদের অদক্ষতা ও দলাদলিতে ফটোগ্রাফারদের আলাদা ক্লাব করার ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি। একই কারণে ক্রীড়া সাংবাদিকরাও আলাদা ক্লাব করেন। প্রবক্তাদের ভাষ্যে — “যাতে ইডেনে টেস্ট ম‍্যাচ ও বড় ম‍্যাচের ফ্রি টিকিটের উপর একক অধিকার নিশ্চিত থাকে।”
প্রসঙ্গত উল্লেখ‍্য, শুরুতে ক্লাব সংবিধানে কেবলমাত্র মুদ্রণমাধ্যম বা প্রিন্ট মিডিয়ার কথা বলা ছিল। পরে দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যম বা অডিও ভিশুয়াল মিডিয়া চালু হওয়ায় সংবিধান সংশোধন করে (পাঠক লক্ষ্য করুন) তাদের স্থান দেওয়া হয়। আরও জানা যায় যে, একসময় ফটোগ্রাফারদের বলা হয়েছিল, অ্যাসোসিয়েশন ভেঙে দিয়ে প্রেস ক্লাবে প্রবেশাধিকারের জন‍্য আবেদন ক‍রতে। কিন্তু অদৃশ‍্য কোনও কারণে, হয়তো তৎকালীন নেতাদের ব‍্যক্তিগত স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখতে প্রস্তাব মানা হয়নি। তথ্যগুলির বহুলাংশই দুই প্রয়াত বরেন‍্য সাংবাদিক জয়ন্ত স‍রকার ও সুদেব রায়চৌধুরির তরফ থেকে জানা বলে জানিয়েছেন প্রাজ্ঞ ও ওয়াকিবহাল সাংবাদিক ও চিত্রসাংবাদিকরা। ওই দু’জনের কেউ আজ নেই। কিন্তু প্রাজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, এই সব কারণেই আজ প্রেস ক্লাব মূলত রিপোর্টার্স ক্লাব ( অন্তত এই বিষয়টি স্বীকার করেছেন তাঁরা)। চিত্রসাংবাদিকরা সদস‍্য হতে পারেন, কিন্তু ভোটে দাঁড়াতে বা ভোট দিতে পারেন না। তার কারণ, ওই আলাদা অ‌্যাসোসিয়েশন! এমনটাই এখনও পর্যন্ত অন্তত বোঝান হচ্ছে। তবুও আশা করা যায়, ভারতের কাছে বিশেষ ঐতিহাসিক দিনে কলকাতা প্রেস ক্লাবেও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ সৃষ্টি করে নতুন সকালের অলৌকিক আলোতে নতুন ইতিহাস রচিত হবে। মুছে যাবে ভেদাভেদ, মুছে যাবে গ্লানি!